ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন পদ্ধতি System of Electric Traction

যে দেশের পরিবহন ব্যবস্থা যত উন্নত দেশ তত উন্নত বলে গণ্য করা হয়। প্রতিনিয়ত দেশের মানুষকে এয়গা হতে অন্য জায়গায় ছুটতে হচ্ছে। প্রয়ােজনের তাগিদে মানুষকে প্রতিনিয়ত দেশের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে গমন হতে হচ্ছে। সচেতন নাগরিক সমাজ প্রয়াস পাচ্ছে কীভাবে তাড়াতাড়ি, নিরাপদে এবং কম খরচে এক স্থান ক অন্য স্থানে যাতায়াত করা এবং মালামাল পরিবহন করা হয়। এর ফলশ্রুতিতে সম্ভব হয়েছে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশনের আবিষ্কার।


ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন শব্দের অর্থ কোন তলের উপর দিয়ে কোন কিছুকে টেনে নেয়া। কোন তলের উপর দিয়ে বৈদ্যতিক শক্তির সাহায্যে কোন কিছুকে টেনে নেয়াকে ইলেকট্রিক ট্রাকশন বলে।

ইলেকট্রিক অ্যাকশন পদ্ধতি (The system of electric traction) ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন পদ্ধতিকে দু'টি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা:

১। যে সকল যান বা গাড়ি কতিপয় বৃহৎ জেনারেটিং স্টেশন কর্তৃক সরবরাহকৃত ডিস্ট্রিবিউটিং নেটওয়ার্ক হতে পাওয়ার গ্রহণ করে। এই ভাগকে আবার দু'ভাগে ভাগ করা হয়েছে; যথা:

(ক) যে পদ্ধতি ডিসি-র সাহায্যে চলে, যেমন- ট্রাম-য়ে, ট্রলি বাস এবং রেলওয়ে;


(খ) যে পদ্ধতি এসি-র সাহায্যে চলে, যেমন- রেলওয়ে;

২। যে সকল যান বা গাড়ি তাদের নিজেদের এনার্জি নিজেরা উৎপাদন বা বহন করে। এতে একটি জেনারেটর ও একটি ইঞ্জিন থাকে। ইঞ্জিনের সাহায্যে জেনারেটরকে ঘুরিয়ে বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপন্ন করা হয় অথবা ব্যাটারি দ্বারা চালানাে হয়। ইঞ্জিন বা প্রাইমমুভারে ব্যবহৃত জ্বালানির নামানুসারে এটা তিন প্রকার, যথা : ১। ডিজেল ইলেকট্রিক ট্রাকশন পদ্ধতি, যেমন- ইলেকট্রিক ট্রেন এবং জাহাজ।

২। পেট্রোল ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন পদ্ধতি, যেমন- ইলেকট্রিক ট্রাক এবং লরি।

৩। ব্যাটারি চালিত ট্র্যাকশন পদ্ধতি, যেমন- ব্যাটারি চালিত সড়ক যান।


আদর্শ ট্রাকশন পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য- আদর্শ ট্র্যাকশন পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য নিম্নে দেয়া হল:

গতিবেগ দ্রুত বৃদ্ধি করার জন্য উচ্চমানের স্টার্টিং টর্ক থাকতে হবে। যে কোন পথে সহজে চলাচল করার জন্য যানবাহনকে অবশ্যই মজবুত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। তা সাময়িকভাবে বিশাল পরিমাণে অতিরিক্ত বােঝা বহন করার ক্ষমতা থাকতে হবে। থানবাহন তৈরি ও চালানাের খরচ কম হতে হবে। যানবাহন থামানাের প্রক্রিয়া মসৃণ হবে এবং খুব কম শক্তি ব্যয় হবে। যানবাহন উচদক্ষতা সম্পন্ন হবে। টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ লাইন যানবাহন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করবে না। গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সহজ হতে হবে। যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম হতে হবে।


ট্রলি-বাস এবং ট্রামের পথের জন্য সরবরাহ এবং বিতরণ পদ্ধতি The feeding and distribution system for tram ways and trolley buses: ইলেকট্রক ট্র্যাকশনের ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক শক্তি কোন উৎপাদন কেন্দ্র বা উপকেন্দ্র হতে স্থির ভােল্টজে ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। যে তারের মাধ্যমে সরবরাহ দেয়া হয়, তাকে ফিডার এবং যে বিন্দুতে সরবরাহ দেয়া হয়, তাকে ফিডিং পয়েন্ট বলে। সুতরাং ফিডারের মাধ্যমে উৎপাদন কেন্দ্রের বাসবারকে ফিডিং পয়েন্টের সাথে সংযােগ করা হয়। বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন ঐলি-তার এবং ট্রাক-রেলের (বা দুই সেট কন্ডাকটর রেল) ডিস্ট্রিবিউটর গঠন করে।


ট্রাম-ওয়ে এবং ট্রলি-বাসের জন্যে নিম্নবর্ণিত শর্তাবলি অবশ্যই পূরণ করতে হবেঃ

(ক) ট্রলি-তারের ভােল্টেজ 550 ভােল্ট এবং উৎপাদন কেন্দ্র বা উপকেন্দ্রের ভােল্টেজ 650 ভােল্টের বেশি হবে না।

(খ) ট্রলি-তারটি কয়েকটি অংশে ভাগ করা থাকে, প্রতি অংশের দৈর্ঘ্য 1.6 কিমি-এর বেশি হবে না।

(গ) ট্রাক-রেলের রিটার্ন পদ্ধতির যে-কোন দুই বিন্দুর বৈদ্যুতিক বিভব পার্থক্য 7 ভােল্টের বেশি হবে না।

(ঘ) রেল এবং আর্থের বিভব পার্থক্য 4 ভােল্টের বেশি হবে না।


উপরের শর্তাবলি পূরণের জন্যে ট্রলি-ওয়্যার এবং ট্রাক-রেলে ফিডিং-এর জন্যে পৃথক ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। ট্রামগাড়িতে = সরবরাহকৃত ভােল্টেজের পরিবর্তন ট্রলি-ওয়্যারের ভােল্টের ঘাটতির উপর নির্ভরশীল। ভােল্টের পরিবর্তন কম হওয়াই বাঞ্ছনীয়। ঐলি-ওয়্যারের ফিডিং-পয়েন্টের দুই বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব নির্ভর করবে এতে ভােল্টেজ ঘাটতি, সেকশনে প্রবাহিত কারেন্টের পরিমাণ এবং ঐলি-ওয়্যারের গুণাবলির উপর অর্থনৈতিক অবস্থা এবং যাত্রীসংখ্যা বিবেচনাপূর্বক ট্রামগাড়িতে ব্যবহৃত ট্রলি-ওয়্যারের সরবরাহ পদ্ধতি নির্বাচন করা হয়। অধিক যাত্রীর যানবাহনের ক্ষেত্রে 0.8 কিমি দৈর্ঘ্যের প্রতি সেকশনে উপকেন্দ্র হতে পৃথক ফিডারের মাধ্যমে এবং কম যাত্রীর যানবাহনের ক্ষেত্রে সেকশনে একটি ফিডারের মাধ্যমে উপকেন্দ্র হতে সরবরাহ করা হয়।

ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন পদ্ধতি System of Electric Traction

চিত্রে ব্যবহৃত ফিডারটির প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল যথেষ্ট বেশি থাকে এবং তা ডিস্ট্রিবিউটরে ফিডিং-পয়েন্টের সাথে । | সংযুক্ত থাকে। এজন্যে দ্বিতীয় পদ্ধতিতে যে-কোন দু'বিন্দুর ভােল্টেজের পরিবর্তন কম হয়। এটা আর্থিক দিক হতেও সুবিধাজনক।


ডিজেল ইলেকট্রিক-ড্রাইভ, ব্যাটারি ইলেকট্রিক-ড্রাইভ এবং ইলেকট্রিক-ড্রাইড লােকোমােটিভ- The ed electric drive, battery electric-drive and electric-drive of locomotive:

রেলপথে এই ধরনের ড্রাইভ ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে ডিজেল ইঞ্জিন সরাসরি রেলগাড়ি টানে না, বরং এটা একটি ডিসি

মােটরের সাথে কাপড় করা থাকে। পরে ডিসি জেনারেটরে উৎপন্ন বৈদ্যুতিক শক্তি মােটরে সরবরাহ করা হয় এবং এই মােটরই গাড়িকে টেনে নিয়ে যায়। ডিজেল ইঞ্জিনের আর.পি.এম. কে সবসময় স্থির রাখা হয়।


এই পদ্ধতির কিছু সুবিধা-অসুবিধা আছে, যা নিয়ে প্রদত্ত হল: সুবিধাসমূহ Advantages:

১। ইলেকট্রিক রেলপথের তুলনায় এই পদ্ধতিতে প্রাথমিক ব্যয় কম, কারণ এটাতে সাবস্টেশন, ডিস্ট্রিবিউশন লাইন, ফিডার, ইত্যাদির প্রয়ােজন হয় না।

২। এর ত্বরণ এবং ব্রেকিং মন্দন উন্নত মানের হওয়ার কারণে স্টিম লােকোমােটিভের তুলনায় এর গতিবেগ বেশি হয়।

৩। স্টিম ইঞ্জিনের তুলনায় ডিজেল ইলেকট্রিক ড্রাইভের ক্ষেত্রে প্রয়ােগকৃত টর্ক উচ্চতর হওয়ার কারণে সুযােগ-সুবিধা অনেক বেশি। ৪। এর রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামতের জন্যে প্রয়ােজনীয় সময় স্টিম ইঞ্জিনের তুলনায় কম।

৫। স্টিম-ইঞ্জিনে স্টিম উঠাতে যে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়ােজন হয়, এটাতে সেই সময়ের প্রয়ােজন হয় না। যে-কোন সময়।

এটাকে চালনা করা যায়।

৬। স্টিম-লােকোমােটিভের তুলনায় এর কর্মদক্ষতা 25% বেশি।

৭। গতি নিয়ন্ত্রণের বেলায় এটাতে পাওয়ার লস হয় না বললেই চলে।


অসুবিধাসমূহ- Disadvantages:

১। অন্যান্য ইঞ্জিনের তুলনায় ডিজেল ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল স্বল্প।

২। ডিজেল-ইঞ্জিন এবং মােটর-জেনারেটর সেট শীতল রাখার জন্যে পৃথক শীতলীকরণ ব্যবস্থা থাকা প্রয়ােজন।

৩। ডিজেল-ইঞ্জিন পরিমিত লােডের চেয়ে বেশি লােড বহন করতে পারে না বিধায় ওভারলােডের ক্ষেত্রে এর সীমাবদ্ধতা আছে।

৪। চলতি এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এটাতে বেশি হয়।

৫। মােটর-জেনারেটর সেট এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদির কারণে ডিজেল-লােকোমােটিভের নিশ্চল-ওজন (Dead-weight)

তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়াতে এটাতে প্রয়ােজনীয় অ্যাক্সেল [(Axle)-চাকার অক্ষদণ্ড] বেশি হয় ।

৬। ডিজেল-ইঞ্জিনে ব্যবহৃত ডিজেল-তেল একটি অতি প্রয়ােজনীয় দ্রব্য বিধায় এর ব্যবহার দেশের অর্থনীতির উপর বােঝা বাড়ায়। অধিকন্তু, তেলের মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধিতে চলতি ব্যয়ে সময়ে সময়ে পরিবর্তন ঘটে।


ব্যাটারি ইলেকট্রিক-ড্রাইভ- The battery electric-drive: এ ধরনের ড্রাইভে প্রােপেলিং ইউনিট ডিসি মােটর দ্বারা গঠিত, যা সেকেন্ডারি ব্যাটারির সাহায্যে চলে । এই ধরনের ড্রাইভ রণত রেলপথে ব্যবহার করা হয়। বহু দূরের পথে সুদীর্ঘ সময়ে উৎস হতে মােটরে সরবরাহে অনিশ্চয়তা হেতু এই পদ্ধতি থ্যর অসুবিধাজনক। তদুপরিবর্তে স্বল্প সময়ের জন্যে ঘন ঘন পরিচালনার ক্ষেত্রে, যেমন- কোচ বা বগি শান্টিং-এর জন্যে এ তা আছে। সহজ-নিয়ন্ত্রণ, কম ওজনের কারণে সংক্ষিপ্ত দূরত্বে এই পদ্ধতি অপেক্ষাকৃত পছন্দনীয়।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post