মােটরের লস এবং দক্ষতা Motor Losses and Efficiency

যে কোন যন্ত্রের সাহায্যে শক্তি রূপান্তরের সময় ইনপুটে যে পরিমাণ শক্তি দেওয়া হয় আউটপুটে ঠিক সেই পরিমাণ শক্তি পাওয়া যায় না। কিছু শক্তি রূপান্তরক কর্তৃক ব্যয়িত হয় যাকে অপচয় বলে। ডিসি মােটরের ক্ষেত্রেও ইনপুটে যে পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তি সরবরাহ করা হয় আউটপুটে সে পরিমাণ যান্ত্রিক শক্তি পাওয়া যায় না। বৈদ্যুতিক শক্তি থেকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরের বিভিন্ন ধাপে শক্তির অপচয় হয়ে থাকে যা মােটরের দক্ষতা নির্ণয়ের জন্য হিসাব করতে হয়।

মােটরের লস এবং দক্ষতা Motor Losses and Efficiency


ডিসি মােটরের লস-সমূহ The losses of DC motors: মােটরের লস বা অপচয়কে জেনারেটরের লসের ন্যায় তিন ভাগে ভাগ করা হয়, যথা:

(ক) কপার লস,

(খ) ম্যাগনেটিক বা আয়রন লস,

(গ) মেকানিক্যাল লস।


(ক) কপার লস বা তামাতে অপচয় (Copper loss)

১। আমেচার কপার লস (Armature copper loss) ৪ অর্থাৎ, I^2Ra

এই লস, ফুল-লােড লসের 30% হতে 40% ।

২। ফিন্ড লস (Field loss)

শান্ট ফিল্ড লস

সিরিজ ফিল্ড লস

ইন্টারপােল ফিল্ড লস

এই লস, ফুল-লােড লসের 20% হতে 30% ।

৩। ব্রাশ কনটাক্ট লস (Brush contact loss)।


(খ) ম্যাগনেটিক বা আয়রন বা কোর লস (Magnetic or iron or core loss)

১। হিসটেরেসিস লস,

২। এডি কারেন্ট লস, এই লস, ফুল-লােড লসের 20% হতে 30% ।


(গ) মেকানিক্যাল লস (Mechanical loss)

১। ফ্রিকশন বা ঘর্ষণজনিত লস, বিয়ারিং-এর মধ্যে শ্যাফটের এবং কমুটেটরের উপর ব্রাশের ঘর্ষণের ফলে এই লস হয়।

২। এয়ার ফ্রিকশন বা উইন্ডেজ লস, আর্মেচারের সাথে বাতাসের ঘর্ষণের ফলে এই লস হয়। এই লসগুলাে, ফুল-লােড লসের 10% হতে 20%


স্ট্রে লস Stray loss: ম্যাগনেটিক এবং মেকানিক্যাল লস-সমূহকে একত্রে সাধারণত স্ট্রে লস বলা হয়।


ডিসি মােটরের আর্মেচার যখন পােলের চুম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে ঘােরে তখন আর্মেচার কয়েলের সাথে সাথে আর্মেচার কোরও। | চৌম্বক বলরেখা কর্তন করে ফলে কোরে তড়িৎ চাপ আবিষ্ট হয়। এই আবিষ্ট তড়িৎ চাপ কোরের মধ্যে একটা ঘূর্ণনশীল কারেন্ট

প্রবাহের সৃষ্টি করে। একেই এডি কারেন্ট বলে। এই কারেন্ট প্রবাহের কারণে কোরে যে পাওয়ার অপচয় হয়, তাকে এডি কারেন্ট লস বলে। এ পাওয়ার লসের ফলে কোর গরম হয়ে উঠে। এজন্য এ অপচয় সবসময় কম হওয়া উচিত।


লস কমানাের উপায়: এডি কারেন্ট লস কমানাের জন্য আর্মেচার কোর সলিড ইস্পাত দ্বারা তৈরি না করে অনেকগুলাে পাতলা পাতলা ইস্পাতের শিট দ্বারা তৈরি করা হয়। এরপর প্রত্যেক শিটের গায়ে পুরু ইনসুলেশন বার্নিশ দেয়া হয় যাতে একটি শিট অন্যটি থেকে আলাদা থাকে। এতে কোরের রেজিস্ট্যান্স বেড়ে যাওয়ায় এডি কারেন্ট কম হয় এবং এডি কারেন্ট লসও কমে যায় ।


হিসটেরেসিস লস Hysteresis loss: ডিসি মােটরের আর্মেচার কোর পােলের চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে অবস্থান করে, ফলে আর্মেচার কোর ইলেকট্রোম্যাগনেট বা তড়িৎ চুম্বকে পরিণত হয়। ঘােরার সময় কোরের কোন অংশ এক পােলের নিচ থেকে অন্য পােলের নিচে গেলে এর চুম্বকত্বের দিক পরিবর্তন হয়। মােটরে পপালের সংখ্যা যত কোর একপাক ঘােরার সময় এর চুম্বকত্বের দিক ততবার পরিবর্তন হয়। কোরের চুম্বকত্বের এই দিক পরিবর্তনের সময় এর আগের চুম্বকত্ব নষ্ট করতে যে বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যয় হয়, তাকেই হিসটেরেসিস লস বলে ।

লস কমানাের উপায়: হিসটেরেসিস লস কমানাের জন্য কাঁচা লােহা বা উচ্চ ভেদ্যতাবিশিষ্ট সিলিকন স্টিল ব্যবহার করা হয়।


সিরিজ, শান্ট এবং কম্পাউন্ড মােটরের গতি নিয়ন্ত্রণ Speed control of series, shunt and compound motors:

শান্ট মােটর

১। প্রয়ােগকৃত ভােল্টেজ পরিবর্তন করে মােটরের গতিবেগ নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতিকে ‘ভােল্টেজ কন্ট্রোল পদ্ধতি' বলা হয়। এই পদ্ধতি দু প্রকার, যথা:


(ক) বহুবিধ ভােল্টেজ নিয়ন্ত্রণ Multiple voltage control: এই পদ্ধতিটি সাধারণত ব্যবহৃত হয় না। এই পদ্ধতিতে অন মােটরের শান্ট-ফিল্ডকে একটি নির্ধারিত এক্সাইটিং ভােল্টেজের সাথে স্থায়ীভাবে সংযােগ করা হয় এবং আর্মেচারকে উপযুক্ত সুইচ

গিয়ারের সাহায্যে বিভিন্ন প্রকার ভােল্টেজ সরবরাহ করা হয়। এই বিভিন্ন প্রকার ভােল্টেজের অনুপাতে আর্মেচারে গতিবেগ হয়। | আবার শান্ট-ফিল্ড রেগুলেটরকে নিয়ন্ত্রণ করে এই গতিবেগগুলাের মাঝামাঝি একটি গতিবেগ পাওয়া যায়।


ওয়ার্ড-লিওনার্ড পদ্ধতি - Ward-Leonard System: এই পদ্ধতিতে একটি মােটর-জেনারেটর সেটের সাহায্যে অন্য | একটি মােটরের গতিবেগ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ধরা যাক, M1, একটি মােটর যার গতিবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। M1, মােটরটির শান্ট

ফিল্ডকে ডিসি সরবরাহ লাইনের সাথে স্থায়ীভাবে সংযােগ করা হয়। এর আর্মেচারে বিভিন্ন মানের ভােল্টেজ প্রয়ােগ করে কাঙ্ক্ষিত গতিবেগ লাভ করা যায়। এই পরিবর্তনযােগ্য ভােল্টেজ একটি মােটর জেনারেটর সেটের জেনারেটর (G) হতে পাওয়া যায় এবং এই সেটের মােটরটি (M2) এসি অথবা ডিসি মােটর হতে পারে।


সেটের মােটরটি (M2) একটি স্থির গতিবেগে ঘুরে এবং জেনারেটরের (G) আউটপুট ভােল্টেজ সরাসরি M1, মােটরে সরবরাহ। করা হয়। আবার জেনারেটরের আউটপুট ভােল্টেজ ফিল্ড রেগুলেটরের সাহায্যে শূন্য হতে সর্বোচ্চ মানে পরিবর্তন করা যায়।

আবার রিভার্সিং সুইচের সাহায্যে জেনারেটরের (G) ফিল্ড কারেন্টের অভিমুখ উল্টিয়ে দিলে উৎপাদিত ভােল্টেজের অভিমুখও উল্টিয়ে যাবে। অতএব, M1; মােটরের ঘূর্ণনের অভিমুখও উল্টিয়ে যাবে। এখানে উল্লেখ্য যে, মোটর জেনারেটর সেটের ঘূর্ণনের অভিমুখ সর্বদা একই দিকে হয়।


ফিল্ড ফ্লার পরিবর্তন করে বা ফ্লাক্স কন্ট্রোল পদ্ধতি ও মােটরের গতিবেগের সমীকরণ থেকে আমরা পাই, মােটরের গতিবেগ ফিল্ড ফ্লাক্সের ব্যস্তানুপাতিক অর্থাৎ N = শান্ট মােটরের ফিল্ড কয়েলের সাথে সিরিজে পরিবর্তনশীল রেজিস্ট্যান্স সংযােগ করে এর মান পরিবর্তনের মাধ্যমে ফিল্ডের কারেন্ট প্রবাহ কমবেশি করা যায়, ফলে ফ্লাক্সের মান পরিবর্তন হয়। ফ্লাক্সের মান পরিবর্তন করে মােটরের গতিবেগ নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে একে ফ্লাক্স কন্ট্রোল পদ্ধতি বলে। সিরিজে সংযুক্ত। পরিবর্তনশীল রেজিস্ট্যান্সটিকে ফিল্ড রেগুলেটর বলে ।

মােটরের লস এবং দক্ষতা Motor Losses and Efficiency

আর্মেচার বা রিওস্ট্যাটিক কন্ট্রোল পদ্ধতি ও মােটরের আর্মেচারের সাথে সিরিজে একটি পরিবর্তনশীল রেজিস্টর সংযােগ রে শান্ট মােটরের গতিবেগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পরিবর্তনশীল রেজিস্ট্যান্সের কারণে আর্মেচার সার্কিটের মােট রেজিস্ট্যান্স বেড়ে মােটরের ব্যাক ইএমএফ কমে, ফলে মােটরের গতিবেগ কমে। রেজিস্ট্যান্স যত বাড়ানাে হবে মােটরের গতিবেগ তত কমবে, এজন্য এ পদ্ধতিকে রেজিস্ট্যান্স কন্ট্রোল বা রিওস্ট্যাটিক কন্ট্রোল পদ্ধতি বলে।


এ পদ্ধতিতে সহজেই মােটরের গতিবেগ অনেক কমবেশি করা যায়। মােটরের গতিবেগ অনবরত পরিবর্তনের দরকার হলে অথবা লােডের পরিবর্তন হলে এ পদ্ধতির দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আর একটি পরিবর্তনশীল রেজিস্ট্যান্স আর্মেচারের সাথে প্যারালালে সংযােগ করা হয় একে আর্মেচার ডাইভার্টার বলে ।

সিরিজ মােটর (Series motor): সিরিজ মােটরের গতিবেগ দু'ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যথা

১। ফিল্ড কন্ট্রোল পদ্ধতি,

২। ভ্যারিয়েবল সিরিজ রেজিস্ট্যান্স পদ্ধতি।


ফিন্ড কন্ট্রোল পদ্ধতি - Field control system:

ডিসি সিরিজ’মােটরের সিরিজ ফিল্ডের আড়াআড়িতে বা প্যারালালে একটি পরিবর্তনশীল (Variable) রেজিস্ট্যান্স সংযােগ করা। হয়, যাকে ডাইভার্টার বা ফিল্ড-ডাইভার্টার বলা হয়। এই ডাইভার্টারকে সুবিন্যস্ত (Adjust) করে এর মধ্য দিয়ে পছন্দানুযায়ী কারেন্ট পাঠানাে যায়। সুতরাং, ইচ্ছামাফিক ফ্লাক্সকে হ্রাস-বৃদ্ধি করা যায়, ফলে মােটরের গতিতবেগও হ্রাস-বৃদ্ধি করা যায়।


একটি ডাইভার্টারকে আর্মেচারের আড়াআড়িতে বা প্যারালালে সংযুক্ত দেখানাে হয়েছে, যাকে আর্মেচার ডাইভার্টার বলা হয়। এই ডাইভার্টারের কাজ হল, আর্মেচারের স্বাভাবিক কারেন্টের কিছু অংশ এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করানাে। ফলে স্থির লােড টর্কের জন্যে যদি আর্মেচার কারেন্ট (I) ডাইভার্টারের কারণে হ্রাস পায়, তবে ফ্লাক্স (0) বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে সরবরাহ কারেন্ট বৃদ্ধি পাবে, যা ফ্লাক্সকে বৃদ্ধি করবে এবং গতিবেগ হ্রাস পাবে, সুতরাং গতিবেগ পরিবর্তন ডাইভার্টারের রেজিস্ট্যান্স পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।


(গ) ট্যাপৃড় ফিন্ড কন্ট্রোল Tapped field control: এই পদ্ধতিতে সিরিজ ফিল্ড ওয়াইন্ডিং হতে অনেকগুলাে ট্যাপিং বের করা হয়, যার ফলে সিরিজ ফিল্ডের টার্ন সংখ্যা ইচ্ছামাফিক কম করা বা বাড়ানাে যায় এবং যা ১৪.৫(খ)নং চিত্রে দেখানাে হয়েছে। ফিল্ডের পূর্ণ টার্নে মােটর এর সর্বনিম্ন গতিবেগ চলতে পারে এবং সিরিজ ফিল্ডে টার্ন কমিয়ে কমিয়ে এর গতিবেগ ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করা যায়। এই পদ্ধতি সাধারণত ইলেকট্রিকট্র্যাকশনে ব্যবহৃত হয়।

মােটরের লস এবং দক্ষতা Motor Losses and Efficiency

ভ্যারিয়েবল সিরিজ রেজিস্ট্যান্স সংযােগ : একটি সিরিজ মােটরের সিরিজ ফিল্ড তথা আর্মেচারের সাথে একটি পরিবর্তনশীল (Variable) রেজিস্ট্যান্স সিরিজে সংযােগ দেখানাে হয়েছে। মােটর টার্মিনালে যে ভােল্টেজ প্রয়ােগ করা হবে, সেই ভােল্টেজই আর্মেচার পাবে না, বরং তার চেয়ে কম ভােল্টেজ পাবে। কারণ পরিবর্তনশীল রেজিস্ট্যান্সে কিছুটা ভােল্টেজ ড্রপ হবে। ফলে কম ভােল্টেজের কারণে মােটরের। গতিবেগও কম হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, এই রেজিস্ট্যান্সের মধ্য দিয়ে পূর্ণ মােটর কারেন্ট প্রবাহিত হবে বিধায় এটাতে বেশ উল্লেখযােগ্য পরিমাণে পাওয়ার অপচয় হবে।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post